Home / গল্প / কৃত্রিম সুন্দরী

কৃত্রিম সুন্দরী

ভাবি,আপনার বড় মেয়েটা ক্রিম ট্রিম কিছু মাখে না?ওর চেয়ে কালো কালো মেয়েরা ক্রিম মেখে ফর্সা হয়ে যাচ্ছে।আর ও যেমন তেমনই আছে।”

পাশের ফ্লাটের মহিলার মুখ থেকে হঠাৎ এমন কথা শুনে মিরার মা কিছুটা বিব্রতবোধ করছে।সে রান্নাঘরে যাওয়ার অযুহাত দেখিয়ে মাথা নিচু করে সেই স্থান ত্যাগ করল।

“রহমান ভাই,আপনার বড় মেয়ের জন্য ভালো একটা সমন্ধ আছে।তবে পাত্রপক্ষ ফর্সা মেয়ে চায়।মিরা দেখতে শুনতে খারাপ না।তবে আরেকটু ফর্সা হলে ভালো হতো।”

ঘটকের মুখ থেকে এমন কথা শুনে মিরার বাবা হা করে তাকিয়ে আছে।তার থেকে কোন উত্তর না পেয়ে সে পুনরায় বলল,”আমার মেয়েরে কত রকম ক্রিম কিনে দেই!আপনিও তো পারেন কিনে দিতে।”

রহমান সাহেব কিছু বললেন না।তবে লজ্জায় তার মাথা নিচু হয়ে গেল।এমন নির্লজ্জ কথা সে আগে কোন দিন শোনেনি।

মিরার বান্ধবীর মায়ের সাথে হঠাৎ মিরার দেখা হয়ে গেল।
-আরে মিরা কেমন আছিস,মা?
-জ্বি আন্টি ভালো।আপনি ভালো আছেন?
-আছি একটু ঝামেলায়।তারিনের তো বিয়ে ঠিক করে ফেললাম।
– আলহামদুলিল্লাহ!তা ঝামেলা কেন?
-আমরা তো কেউ রাজিই ছিলাম না।কিন্তু পাত্রপক্ষ যেভাবে চেপে ধরলো না করার উপায় পেলাম না।দশ ভড়ি সোনা দিতে চায়।আমাদের থেকে কিচ্ছু চায় না।শুধু আমার তারিনরে ভিক্ষা চায়।মেয়ে আমার দেখতে মাসাল্লাহ কিনা!
-জ্বি আন্টি। তারিন দেখতে খুবই সুন্দর।
-তুই কতকাল এভাবে থাকবি?মুখ দেখে তো মনে হয় না রুপচর্চা করিস।ক্রিম ট্রিম মাখবি,পার্লারে যাবি।বুঝলি?আজ আসি রে।
-ভালো থাকবেন।

আন্টির কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই মিরা ক্যাম্পাসে চলে আসলো।বান্ধবীরা সবাই গোল হয়ে বসে গল্প করছে।সেও যোগ দিল।কথায় কথায় রিয়া বলল,কার কেমন বর পছন্দ আজ জানা যাক?
সবাই হাততালি দিয়ে সম্মতি জানালো।

রিতু বলল,প্রেম করার সময় শাহরুখ খান।আর বিয়ের সময় পয়সাওয়ালা কালা চাঁন!

মাইসা বলল,আমারতো বিয়ে হয়েই গেছে।ও আমাকে ভিশন ভালোবাসে।আমি নাকি ওর সুন্দরী প্রিয়তমা!যা পাগলামি করে বিয়েটা করলো।বেচারা এখন জীবীকার তাগিদে দেশের বাইরে।

মাইসার কথায় তাল দিয়ে তারিনও বলল,এক সপ্তাহের মধ্যে আমার বিয়ে তোরা তো জানিসই।জানিস, শশুর বাড়ির সবাই খুব খুশি!বর তো পাগল প্রায়।অনেক টাকাপয়সার মালিক।আমার আর কিছু চাই না।

তায়েবা বলল,সুন্দর করে কথা বলতে হবে,রুচিশীলতার পরিচয় দিতে হবে সব কিছুতে।

এরই মধ্যে সবাই উঠার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।মিরা থামিয়ে বলল, আমার পছন্দ শুনবে না?

মিরার এমন কথায় সবাই সবার দিকে তাকাতাকি করতে লাগলো।রিয়া এতক্ষণ চুপ থাকলেও এখন একরাশ বিষ্ময় নিয়ে বলেই ফেললো,তোমারও পছন্দ আছে!

বেশ বোঝা যাচ্ছে তাদের ধারণা সে কালো বলে তার পছন্দ থাকতে পারে না।কেউ দয়া করে বিয়ে করলেই ঢের তার আবার পছন্দ অপছন্দ কিসের?

মিরা আর কিছু না বলে সেই স্থান ত্যাগ করে চলে গেল।ক্লাস করার ইচ্ছেটাই তার মরে গেল।

রাতে ঘুমানোর আগে গল্পের বই পড়ছিল মিরা এমন সময় একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন আসলো।পরিচয় জানার পর বুঝতে পারল তারই স্কুল ফ্রেন্ড মিতু।ক্লাস নাইনে ওর বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর আর যোগাযোগ হয়নি।মিতু খুব আগ্রহ নিয়ে জানালো আগামীকালই সে দেখা করতে চায়।মিরাও দ্বিমত পোষণ করল না।বেশ খুশিই হয়েছে সে;এতবছর পর ছেলেবেলার বান্ধবীর সাথে দেখা করতে চলেছে সে।

পরদিন সকালে একটা রেস্টুরেন্টে তারা দেখা করল।কথায় কথায় মিতু বলল,
-আমার ভাইয়ার কথা তোর মনে আছে?
-হ্যাঁ।
-ভাইয়ার সেনাবাহিনীতে চাকরি হয়েছে।

মিরা চোখে খুশির চমক এনে বলল,বাহ্!খুব ভালো কথা!আনন্দের সংবাদ!

মিতু মুখে চিন্তার ছাপ ফেলে বলল,ভাইয়ার জন্য মেয়ে দেখা হচ্ছে।

মিতু সরল মনে বলল,বাহ্ আবার তোদের বাড়ি বিয়ে লাগবে!

মিতু নাক সিটকে কিছুটা তাচ্ছিল্যের সাথেই বলল,তুই মিরা সেই আগের মতোই আছিস।আমি ভাবছিলাম তুই ভার্সিটিতে পড়িস না জানি কত পরিবর্তন হইছে তোর।

এমন কথায় মিরা থমকে গেল।তার মনে হচ্ছে পরিবর্তন হওয়াটা কি খুব জরুরি?

মিরার থেকে উত্তর না পেয়ে সে এবার খাবার মুখে নিয়ে চিবুতে চিবুতে বলল,শোন একটু মডার্ন হ।ক্রিম ট্রিম মাখ।গোল্ড পার্ল ব্যবহার করতে পারিস। ভালো কাজ করে।

লজ্জায় মিরার বুকের ভিতর পর্যন্ত কাঁপছে।মুখ ফুটে কিছু বললেই যেন কথাগুলো জড়িয়ে যাবে।তাই সে কিছু না বলে কেবল ফ্যাকাসে হাসি দিল।

এই একই কথা ছেলেবেলার বান্ধবীর মুখ থেকেও শুনবে এটা সে ভাবতেই পারেনি।আজ তার মধ্যে একটা বিরক্তিভাব চলে আসলো।কিন্তু বিরক্ত প্রকাশ না করে বিদায় নিয়ে চলে আসল।

নিজেকে খুব বেশি ব্যর্থ আর অসহায় লাগছে মিরার। বিভিন্ন চিন্তা ভাবনা করে অবশেষে সিদ্ধান্ত নিল, ক্রিম আজ কিনবোই।

চলে গেল মার্কেটে।দোকানদারদের পরামর্শে ডিউ ক্রিম নিয়ে বাড়ি চলে আসল।রাতে ক্রিমটা মুখে লাগানোর সময় খুব অস্বস্তি হচ্ছিল তার।সারামুখে ক্রিম লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ চলে গেল।তার মুখ খুব ঘামতে শুরু করল।ফোনটা হাতে নিয়ে টর্চ অন করতেই কয়েকটা বাচ্চা মশা এসে মুখে বসতেই মুখে লেগে গেল।সে বলে উঠলো,উফ্ কি যে বিরক্তিকর!

বিদ্যুৎ চলে আসতেই ফ্যান ঘুরে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে চুলগুলো অবাধ্যতার সীমা ছাড়িয়ে কালবৈশাখী ঝড়ের গতিতে উড়ে এসে মুখের সাথে লেগে যেতে লাগলো।কিছুতেই সামলানো যাচ্ছে না।অবশেষে। দশ বারোটা ক্লিপ লাগিয়ে চুলগুলোকে নিয়ন্ত্রণে এনে সুয়ে পড়ল।

এই ক্রিম মেখে ঘুমানো তার কাছে অভিশাপ মনে হচ্ছে।রাতের ঘুমটা তার ভালো হলো না।এত কষ্ট সহ্য করে রুপ সচেতন মেয়েরা ফর্সা ত্বক পাওয়ার লোভে রাতের ঘুমটাও শান্তিতে ঘুমায় না এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কি হতে পারে!

পরদিন সকাল সকাল মিরার মনে হলো অকারণেই তার মুখ ঘামছে।একদম ভালো লাগছে না তার।সিদ্ধান্ত নিল, ক্রিম মেখে রাতের ঘুম হারাম করার মানে হয় না;পার্লারে গিয়ে ফেসিয়াল করে আসি।

পার্লারে ঢুকে একটা মেয়েকে দেখে চিন্তায় পড়ে গেল।খুব চেনাচেনা লাগছে।কোথায় যেন দেখেছি…কোথায় যেন দেখেছি….ভাবছে।হঠাৎ খেয়াল হলো এই মেয়ের সাথে সুমনের ভাইয়ার বিয়ের কথা চলছে যার নাম সাথী।খুব অহংকার করে সুমন বলেছিল,আমার হবু ভাবি এক কথায় সিনেমার নায়িকা।মিরা মনে মনে বলল,তা অবশ্য ঠিক বলেছে কারণ নায়িকাদের প্রধান কাজ রুপচর্চা করা।

সে চিন্তা ভাবনা বাদ দিয়ে সাথীর দিকে মনোযোগ দিতেই শুনতে পারল পার্লারের মহিলা তাকে বলছে,
-তুমি কোন ক্রিম ব্যবহার কর?
-চাদনী।

মহিলা সাথীর থুতনি ধরে একবার এপাশ আরেকবার অপাশ করে বলল,দেখছো মুখের কি অবস্থা করছো?রোদে যাওয়ার সাথে সাথেই তো মনে হয় মুখ লাল হয়ে যায়,তাই না?

সাথী অসহায়ের মতো মুখ করে বলল,হু।রান্না করলেও দুই গাল লাল হয়ে যায়।

মহিলা খানিক শাষণের ভঙ্গিতে বলল,সারা মুখে বড় বড় লোমে ছেয়ে গেছে।ছেলেদের মতো মোছ উঠে গেছে।

সাথী বেশ চিন্তিত মুখে বলল,কি করা যায় এখন আপনিই বলুন না!

মহিলা বলল,সারা মুখের লোম তুলে একটা ফেসিয়াল করে দিচ্ছি।এসব ক্রিম ব্যবহার করলে নিয়মিত ফেসিয়াল আর আপার লিপ করতেই হবে।

মহিলা যখন সাথীর সারা মুখ থেকে লোম তুলে নিতে শুরু করল তখন সে অসহ্য ব্যথায় কেঁপে উঠলো।মহিলা কড়া নির্দেশ দিল,”একদম নড়াচড়া নয়।গাল কেটে যাবে।”সে এবার ব্যথার মরন কামড় সহ্য করে নড়াচড়া না করে মূর্তির মতো পড়ে রইল।

মিরার আর পার্লারে থাকা হলো না।

বাসায় এসে দেখে সেই আন্টি আবার এসে তার মায়ের সাথে খোশগল্প করছে।তাকে দেখা মাত্রই সহাস্যে বলে উঠলো,”মিরা, ক্রিম মাখবা।সবাই মাখে।এটা কোন দোষ না।”

মিরা আজ আর সহ্য করতে না পেরে বলেই ফেলল,আন্টি সৌন্দর্যের মাপকাঠি কি শুধু ফর্সায়?আমি সবার মতো কেন হব?আমার নিজস্ব ব্যক্তিসত্তা রয়েছে।আমি আমাকে খুব ভালোবাসি।আমার মাও আমাকে খুব ভালোবাসে।আমার ছোট বোন ফর্সা তবুও মা কোনদিন আমাদের দু’বোনকে আলাদা চোখে দেখেনি।পরের চোখে নিজেকে ফর্সা দেখাতে কেন অহেতুক ঝামেলা করতে যাব বলেন তো?

আন্টি আর কিছু বলল না।হাসি মুখটা কালো করে চলে গেল।

সন্ধ্যায় সেই ঘটক মশাই আবার আসল।মিরার বাবাকে বলল,”কাল পাত্রপক্ষকে নিয়ে আসতে চাই।ডাকেন তো আপনার মেয়েকে একটু দেখি।”

মিরা তার সাথে দেখা করে দরজা পর্যন্ত আসতেই শুনতে পেল ঘটক তার বাবাকে বলছে,”মেয়ে তো আগের মতোই আছে।যাই হোক পার্লার থেকে সাজিয়ে রাখবেন।”

মিরা পুনরায় তার সামনে গিয়ে বলল,দেখুন আংকেল আমি বা আমার পরিবার লোক ঠকাতে চাই না।পাত্রপক্ষ যদি ফর্সা মেয়ে চায় তবে তাই দেখান।আর আমার বাবা আপনার মতো ছোট মনের মানুষ না যে নিজের মেয়েকে ফর্সা হওয়ার ক্রিম কিনে দিয়ে ছোট করবে।আর চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিবে,মেয়ে তুমি কালো;তোমাকে পার করতে আমার অনেক সমস্যা হবে;এই নাও ক্রিম; তুমি ফর্সা হয়ে আমাকে উদ্ধার কর আর নকল রুপ দিয়ে ছেলেদের মাথা নষ্ট কর।

ঘটক বেশ অপমানিত ও রাগান্বিত হয়ে বিড়বিড় করতে করতে চলে গেল।

কারও মুখের উপর এত কড়া কথা আগে কোনদিন বলেনি মিরা।আজ তার বুক ধরফড় করছে।মুহুর্তেই ঠোঁট

 

.
লিখিকা-রুপা ইসলাম

About Admin Md. Lokman Hossen

আমার এ প্রেম নয় তো ভীরু, নয় তো হীনবল - শুধু কি এ ব্যাকুল হয়ে ফেলবে অশ্রুজল। মন্দমধুর সুখে শোভায় প্রেম কে কেন ঘুমে ডোবায়। তোমার সাথে জাগতে সে চায় আনন্দে পাগল।

Check Also

বাবু তোমার একটা লুঙ্গী পরা পিক দিবা? [বেস্ট রোমান্টিক রম্য গল্প -২০১৯ ]

বাবু তোমার একটা লুঙ্গী পরা পিক দিবা? [বেস্ট রোমান্টিক রম্য গল্প -২০১৯ ]

মাঝরাতে গার্লফ্রেন্ড ফোন দিয়ে বলল ‘বাবু তোমার একটা লুঙ্গী পরা পিক দিবা?’ গার্লফ্রেন্ডের মুখ থেকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *